আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি, চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস

ovibsnbd admin
5 Min Read

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলাদেশের সাংবিধানিক নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয়, পূর্ব সীমান্তে আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম, দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে মিয়ানমারের চিন ও রাখাইন রাজ্য এবং দক্ষিণ উপকূলে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত।[১৪] ভৌগোলিকভাবে পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপের সিংহভাগ অঞ্চলজুড়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ড অবস্থিত। জনসংখ্যার বিচারে প্রায় ২০ কোটিরও অধিক জনসংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ৭ম বৃহত্তম দেশ।[১৫] নদীমাতৃক বাংলাদেশ ভূখণ্ডের উপর দিয়ে বয়ে গেছে ৫৭ টি আন্তর্জাতিক নদী। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে ও দক্ষিণ-পূর্বে টারশিয়ারি যুগের পাহাড় মেঘের সাথে মিশে আছে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন ও দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সৈকত কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশে অবস্থিত।[১৬]

দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ও ধ্রুপদি যুগে বাংলাদেশ অঞ্চলটিতে বঙ্গ, পুণ্ড্র, গৌড়, গঙ্গাঋদ্ধি, সমতট, হরিকেল প্রভৃতি জনপদ গড়ে উঠেছিল। মৌর্য যুগে মৌর্য সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ ছিল অঞ্চলটি। জনপদগুলো নৌ-শক্তি ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। মধ্যপ্রাচ্য, রোমান সাম্রাজ্যে মসলিন ও রেশম বস্ত্র রপ্তানি করতো জনপদগুলো। প্রথম সহস্রাব্দে বাংলাদেশ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গৌড়, পাল সাম্রাজ্য, চন্দ্র রাজবংশ, সেন রাজবংশ গড়ে উঠেছিল। বখতিয়ার খলজির ১২০৪ সালে গৌড় জয়ের পরে ও পরবর্তীকালে দিল্লি সালতানাত শাসনামলে এ অঞ্চলে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপীয়রা শাহী বাংলাকে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী বাণিজ্যিক দেশ হিসেবে গণ্য করতো।[১৭]

মুঘল আমলে বিশ্বের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের (জিডিপি-র বৈশ্বিক সংস্করণ) ১২ শতাংশ উৎপন্ন হতো সুবাহ বাংলায়,[১৮][১৯][২০] যা তৎকালীন সমগ্র পশ্চিম ইউরোপের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের চেয়েও বেশি ছিল।[২১] ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ের ফলে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা অঞ্চলে শাসন শুরু করে। ১৭৬৫ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ভূখণ্ডটি প্রেসিডেন্সি বাংলার অংশ ছিল। ১৯৪৭-এ ভারত বিভাজনের পর বাংলাদেশ অঞ্চল পূর্ব বাংলা (১৯৪৭–১৯৫৬; পূর্ব পাকিস্তান, ১৯৫৬–১৯৭১) নামে নবগঠিত পাকিস্তান অধিরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত বাংলা ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ হলে পশ্চিম পাকিস্তানের বিবিধ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ভারতের সহায়তায় গণতান্ত্রিক ও সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ৩০ লক্ষ শহিদের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় ঘটেছে দুর্ভিক্ষ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ; এছাড়াও প্রলম্বিত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও পৌনঃপুনিক সামরিক অভ্যুত্থান এদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বারংবার ব্যাহত করেছে। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৯১ সালে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় যার ধারাবাহিকতা আজ অবধি বিদ্যমান। সকল প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গত তিন দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতি ও সমৃদ্ধি সারা বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

জনসংখ্যায় বিশ্বে সপ্তম বৃহত্তম দেশ বাংলাদেশ, যদিও আয়তনে বিশ্বে ৯১তম।[২২] ৬টি ক্ষুদ্র দ্বীপ ও নগররাষ্ট্রের পরেই বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। মাত্র ৬৫ হাজার বর্গমাইলের (প্রায় ১ লক্ষ ৪৮ হাজার বর্গকিলোমিটার) এই ক্ষুদ্রায়তনের দেশটির জনসংখ্যা ২০ কোটির বেশি অর্থাৎ প্রতি বর্গমাইলে জনবসতি ৩,০০০ জন (প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১৪০০ জন)।[২৩] ১৭.৫৮ কোটির অধিক জনসংখ্যাবিশিষ্ট দেশগুলির মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনবসতি ১৪০০ জন। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ১০০% মানুষের মাতৃভাষা বাংলা; সাক্ষরতার হার প্রায় ৮০%।[২৪][২৫]

বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। ২০১৭–১৮ অর্থবছরে চলতি বাজারমূল্যে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণ ছিল ২২,৫০,৪৭৯ কোটি টাকা (প্রায় ২৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।[২৬] পরবর্তী সময়ে দেশের জিডিপি ও মাথাপিছু আয় উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে।বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২২ ও ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি হয়েছে এবং মাথাপিছু আয় নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের মানদণ্ড অতিক্রম করেছে।[২৭]

দেশটির সরকারি হিসাবে ২০১৭–১৮ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ১,৭৫২ মার্কিন ডলার এবং ২০১৮–১৯ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১,৯০০–১,৯৫০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়।[২৮] পরবর্তী বছরগুলোতে তৈরি পোশাক রপ্তানি, প্রবাসী আয়, কৃষি ও সেবা খাতের সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। তবে কোভিড-১৯ মহামারি, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের মতো কারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা শ্লথ করেছে।[২৯]

দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পারিবারিক আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুসারে জাতীয় দারিদ্র্যের হার প্রায় ১৮-১৯ শতাংশ এবং অতিদারিদ্র্যের হার প্রায় ৫–৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যদিও অঞ্চল ও আয়ের স্তরভেদে বৈষম্য এখনও বিদ্যমান।[৩০] শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাতৃমৃত্যু ও শিশু মৃত্যুহার এবং গড় আয়ুর মতো মানব উন্নয়নের সূচকেও ধারাবাহিক উন্নতি লক্ষ্য করা যায়।[৩১]

বাংলাদেশ গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর উর্বর অববাহিকায় অবস্থিত। দেশের নিম্নভূমি চরিত্রের কারণে প্রায় প্রতি বছর মৌসুমি বন্যা দেখা দেয়; এছাড়াও উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙন সাধারণ ঘটনা।[৩২] এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের কৃষি উৎপাদন ও জীবিকায় প্রভাব ফেললেও দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *